মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২:১৯ অপরাহ্ন
নোটিশ :

জেলা/উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ : সাপ্তাহিক গাইবান্ধার বুকে পত্রিকার জন্য গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থান/এলাকায় প্রনিতিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট সাইজের এক কপি ছবিসহ সরাসরি অথবা ডাকযোগে সম্পাদক বরাবর আবেদন করুন। প্রকাশক ও সম্পাদক, সাপ্তাহিক গাইবান্ধার বুকে , গোডাউন রোড, কাঠপট্টী, গাইবান্ধা। ফোন: : ০১৭১৫-৪৬৪৭৪৪, ০১৭১৩-৫৪৮৮৯৮

পেঁয়াজ বিক্রির নামে চলছে হরিলুট

স্টাফ রিপোর্টার / ৩৭ Time View
Update : রবিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৩, ৫:১০ পূর্বাহ্ন

পেঁয়াজ নিয়ে লাগামহীন মুনাফা করতে এবার শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাত দিনের টার্গেট ধরে মাঠে নেমেছে। এ সময়ের মধ্যে চক্রের সদস্যরা ভোক্তার পকেট থেকে পাঁচ শতাধিক কোটি টাকা হরিলুটের পাঁয়তারা করছে।

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এমন ছক আঁকা হয়েছে। পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সংবাদ শুক্রবার বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পরই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম হুহু করে বাড়তে থাকে।

শুক্রবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত দফায় দফায় প্রতি কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। শনিবার তা আরও ৫০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজিতে গড়ে ১০০ টাকা বেড়ে যায়। আমদানি করা পেঁয়াজ বৃহস্পতিবার ছিল ১১০ টাকা কেজি। শনিবার তা বিক্রি হয়েছে ২১০ টাকা কেজিতে। একই সময়ের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ ১৩০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। একদিনের ব্যবধানে গড়ে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ১০০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ২৪০ টাকায় এবং আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা কেজি। ভারতের এক ঘোষণায় নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম বেপরোয়া গতিতে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাসাধারণ ফের ভোগান্তিতে পড়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও এ মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, দেশে চলতি বছরে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। আমদানিও হয়েছে অনেক। বাজারে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে।

অন্যান্য পেঁয়াজও বাজারে চলে এসেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ আরও বাড়বে। তখন দেশি পেঁয়াজেই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এছাড়া আগের পেঁয়াজের সরবরাহও রয়েছে পর্যাপ্ত। ফলে বাজারে এ পণ্যের কোনো সংকট নেই। তাই বেপরোয়া গতিতে এর দাম বাড়া একেবারেই অযৌক্তিক।

এদিকে পেঁয়াজের মূল্য নিয়েন্ত্রণে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে মূল্য নিয়ে কারসাজি করায় দুই ব্যবসায়ীকে সাত দিন জেল দিয়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পক্ষ থেকেও ভর্তুকি মূল্যে কেজিপ্রতি ৫০ টাকা করে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, সুযোগ পেলেই ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এবারও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

পরিস্থিতি এমন-নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসা পর্যন্ত সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নেওয়ার ছক তৈরি করেছেন। সরকারসংশ্লিষ্টরাও যেন গাছাড়া ভাব নিয়ে ওই সাত দিনের অপেক্ষায় আছে, যা কোনোভাবেই ঠিক না। তাই ভোক্তাদের এই ভোগান্তি থেকে বের করতে এবার অসাধুদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, তা না হলে মূল্য কারসাজির এই মহোৎসব সব সময় চলতে থাকবে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নির্বিঘ্নে কারসাজি করছে চিহ্নিত সিন্ডিকেট, কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এর পুনরাবৃত্তি হবেই।

সূত্র জানায়, চলতি বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়েছে। এ কারণে দেশটিতে এর দাম বাড়ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত আগস্টে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।

কিন্তু এতেও ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি খুব একটা কমছিল না। ফলে তারা রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে ২৯ অক্টোবর পেঁয়াজের প্রতি টনের রপ্তানি মূল্য সর্বনিম্ন ৮০০ ডলার নির্ধারণ করে দেয়। এতেও ভারতের বাজারে পণ্যটির দাম কমছিল না। ফলে বৃহস্পতিবার তারা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে।

ভারতের আদেশে বলা হয়, এ আদেশ জারির আগেই যেসব পেঁয়াজ রপ্তানির এলসি খোলা হয়েছে, যেসব পেঁয়াজ রপ্তানির জন্য জাহাজীকরণ করা হয়েছে, শিপিং বুকিং প্রস্তুত করা হয়েছে-এমনসব পণ্য রপ্তানি করতে কোনো বাধা নেই। এর বাইরে কোনো দেশের জরুরি প্রয়োজনে পেঁয়াজের দরকার হলে সে দেশের সরকারের কাছে আবেদন করলে তারা বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

এছাড়া কোনো রাজ্যসরকার তার নিজস্ব চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উদ্বৃত্ত থাকলেও রপ্তানি করতে পারবে।

ফলে বাংলাদেশ যেসব পেঁয়াজ রপ্তানির এলসি করেছে; কিন্তু এখনো দেশে আসেনি সেগুলো দেশে আসতে কোনো বাধা নেই। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে ভারত থেকে ৩৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার টন চলে এসেছে। আরও ১৫ হাজার টন আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে এসব পেঁয়াজ আমদানিতে উদ্যোক্তারা ধীরগতি অনুসরণ করছেন। কারণ, দেশী পেঁয়াজ ইতোমধ্যে উঠতে শুরু করেছে। এর দামও অচিরেই কমে যাবে। যে কারণে এখন পেঁয়াজ আমদানি করা থেকে বিরত থাকছেন উদ্যোক্তারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৮ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ বছর দেশে প্রায় ৩৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হবে। কিন্তু মজুত অসুবিধার অভাবে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। এ হিসাবে নষ্ট হবে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন। ফলে নিট উৎপাদন বাবদ থাকছে ২৫ লাখ ৫০ হাজার টন।

এর বাইরে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। বছরে আমদানি করা হয় আট লাখ টনের বেশি। এসব মিলে চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ দেশের বাজারে সরবরাহ ও মজুত হিসাবে রয়েছে। এছাড়া অনেক পেঁয়াজ দেশে আসতে পাইপলাইনে আছে। ফলে এ মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজের কোনো ধরনের সংকট নেই। তারপরও কথিত সিন্ডিকেট ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের দোহাই দিয়ে পরিকল্পতিভাবে এর দাম বাড়াচ্ছে।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। এ সংবাদের পর কিছু ব্যবসায়ী কম দামে কেনা পেঁয়াজ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। তাই মূল্য নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদারকি করা হচ্ছে। এ সময় ক্রয় ও বিক্রয় রসিদ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সাত দিন পর দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজারে এসে যাবে। তখন দাম এমনিতেই কমে আসবে।

প্রাপ্ত্য তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৭ হাজার ৬৭১ টন বা ৭৬ লাখ ৭২ হাজার কেজির চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজিতে গড়ে অতিরিক্ত ১০০ টাকা মুনাফা করলে দিনে মুনাফা হচ্ছে ৭৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৭ দিনে ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত মুনাফা হিসাবে সিন্ডিকেটের পকেটে যাবে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকা।

আগামী কয়েকদিনে দাম বাড়লে আরও বেশি টাকা চলে যাবে সিন্ডিকেটের কবজায়। এছাড়া পেঁয়াজের এ দাম যদি আরও বেশি দিন স্থায়ী হয়, তাহলে কথিত কারসাজির চক্রটি আরও বেশি মুনাফা করবে। এর আগে শুক্রবারও দাম বাড়িয়ে চত্রুটি আরও কিছুটা মুনাফা করেছে।

রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী শংকর চন্দ্র ঘোষ বলেন, আমদানিকারকরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে অতি মুনাফা করতে সাত দিনের টার্গেট নিয়েছে। কারণ, সাত দিন পরই দেশের পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজারে এসে যাবে। তখন এমনিতেই দাম কমতে থাকবে। তবে ক্রেতাদেরও কিছু দোষ আছে। তারা দাম বাড়ার কথা শুনে বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এতে সুযোগ বুঝে সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন, যা ঠিক না।

ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান: পেঁয়াজের মূল্য স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীসহ ৫৪টি জেলায় অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার সারা দেশে ৫৭টি টিম বাজার অভিযানের মাধ্যমে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করে। এ দিন অধিদপ্তরের পক্ষ থকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ভোক্তার অধিকার রক্ষায় অধিদপ্তরের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

খাতুনগঞ্জ থেকে পেঁয়াজ উধাও: দুদিন আগেও পেঁয়াজে ঠাসা ছিল চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই। এখানকার প্রধান আড়ত হামিদুল্লাহ মিয়া বাজারসহ বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনেই বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ রাখা ছিল। কিন্তু শনিবার সকাল থেকে হঠাৎ পেঁয়াজ উধাও হয়ে গেছে। ভোর থেকে বিক্রেতারা দোকান বা আড়তের সামনে থেকে পেঁয়াজের বস্তা সরিয়ে নিয়েছে। শত শত টন পেঁয়াজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে জেলার বাইরে বিভিন্ন মোকামে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাড়তি দামে বিক্রির জন্যই ব্যবসায়ীরা এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এ বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে প্রায় দেড়শ টাকা বাড়তি হাঁকা হচ্ছে। অর্থাৎ যে পেঁয়াজ বৃহস্পতিবার বিকালেও প্রতি কেজি ১০৫-১০৭ টাকা বিক্রি হয়েছে, শনিবার সেই একই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর